বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর বিএনপি সরকারের দেড় মাস অতিবাহিত হতে চলেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় ইরান যুদ্ধের দামামা। ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলের ‘ভারত-ঘনিষ্ঠ’ নীতি এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ’ বলয় পেরিয়ে নতুন এই সরকার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোন দিকে ঝুঁকছে তা নিয়ে এখন দেশি-বিদেশি মহলে চলছে ব্যাপক চুলচেরা বিশ্লেষণ।
পররাষ্ট্রনীতির এই জটিল সমীকরণ নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ফরেন পলিসি নির্দিষ্ট কোনো দেশকে কেন্দ্র করে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নির্ধারিত হবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, “আমাদের অগ্রাধিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ। দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক প্রতিটি সম্পর্কই হবে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে। কে নাখোশ হলো, সেটা বড় কথা নয়; দেশের মানুষ কিসে ভালো থাকবে, সেটাই মূল বিবেচ্য।”
নতুন সরকারের জন্য প্রথম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান যুদ্ধ। শুরুর দিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার নিন্দা জানালেও মার্কিন হামলার বিষয়ে নীরব থেকেছে ঢাকা। এতে ইরানের পক্ষ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এলেও, সরকার পরে ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, নতুন সরকারকে এখনই কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে ফেলার সময় আসেনি, তাদের বোঝার জন্য আরও কিছুটা ‘গ্রেস পিরিয়ড’ প্রয়োজন।
বিএনপি সরকারের সামনে এখন তিনটি প্রধান শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ:
১. যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সরকারের সম্পর্ক বেশ উষ্ণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিঠিতে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের উল্লেখ থাকায় বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন ঢাকাকে তাদের নিরাপত্তা বলয়ে দেখতে চায়।
২. ভারত: দীর্ঘ ১৬ বছর ভারত-ঘনিষ্ঠ সরকারের পর এখন দিল্লির সাথে সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন দৃশ্যমান। তবে সীমান্ত নিরাপত্তা ও জ্বালানি আমদানির প্রয়োজনে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রাখা অপরিহার্য।
৩. চীন: বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিশাল বিনিয়োগের জন্য বেইজিং এখনো অপরিহার্য। তিস্তা প্রকল্প হবে চীন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এক ‘লিটমাস টেস্ট’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে পড়া হবে ‘দলভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি’। তাঁর মতে, জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত্য প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশ ‘প্রো-চায়না’ বা ‘প্রো-আমেরিকা’ ট্যাগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
অন্যদিকে, হুমায়ুন কবীর সতর্ক করে বলেন, “আমাদের রপ্তানি যায় পশ্চিমে, কিন্তু কাঁচামাল আসে পূর্ব থেকে। এই চেইন ছিঁড়ে কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের নেই।”
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারতের কাছে ডিজেলে সহায়তা চাওয়া, আবার বাণিজ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া সব মিলিয়ে বিএনপি সরকার আপাতত ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্য রক্ষার নীতিতেই এগোচ্ছে। তবে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর পাল্টাপাল্টি চাপ সামলে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি কতটা সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :